সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

সুন্দরবন আমার অহঙ্কার, আমার ভালবাসা

বেণুবর্ণা অধিকারী

সুন্দরবন নামের ব্যাখ্যা নিয়ে নানান মত রয়েছে। মত যাই থাক আমার আকর্ষনের বিষয় হতো এর উদ্ভিদ। উদ্ভিজ্জ সুন্দরবনের গাছপালার অধিকাংশই ম্যানগ্রোভ ধরনের এবং এখানে রয়েছে বৃক্ষ, লতাগুল্ম, ঘাস, পরগাছা এবং আরোহী উদ্ভিদসহ নানা ধরনের উদ্ভিদ।
সুন্দরবনে এখনো যেতে পারিনি সেভাবে, শুধু করমজলে গিয়েছি। তাই সুন্দরবনের কাছে অপরাধবোধ থেকেই তাকে পাঠ করে আত্মীকরণ করলাম। নিশ্চয় সময় ও সুযোগ পেলে আমি সুন্দরবনে কয়েকদিন থাকব। ৩ দিনের কমার্শিয়াল ট্যুর করে এই ইচ্ছে পূরণ হবে না।

পৃথিবীর অন্য অঞ্চলের গাছপালা থেকে এই অঞ্চলের গাছপালার বিশেষত্ব হল, এখানকার প্রায় সব গাছই লবণ সহ্য করতে পারে। দ্বিতীয় বিশেষত্ব হল, এই গাছগুলো নরম কাদার ওপর জন্মায়। তৃতীয়ত, এই সকল গাছ প্রবল বাতাস এবং প্রচণ্ড স্রোতে অসংখ্য শিকড়ের সাহায্যে এই নরম মাটির ওপর সহজেই দাঁড়িয়ে থাকতে পারে। জোয়ারের পানিতে গাছের গোঁড়া সবসময় ধুয়ে গেলেও গাছের কোনো ক্ষতি হয়না। বাতাস থেকে অক্সিজেন ও জলীয় বাষ্প নেওয়ার জন্য এই গাছেদের শূলের মতো সূচালো শ্বাসমূল থাকে। ১৯০৩ সালে ডি. প্রেইন সুন্দরবনের গাছপালার উপর লিখিত বইয়ে ২৪৫ গণের অধীনে ৩৩৪টি উদ্ভিদ প্রজাতি লিপিবদ্ধ করেছেন। আজ পর্যন্ত জানা প্রায় ৫০টি প্রকৃত ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদ প্রজাতির মধ্যে কেবল সুন্দরবনেই আছে ৩৫টি প্রজাতি। অধিকাংশ ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদ চিরসবুজ, খাটো, গুল্মজাতীয় অথবা লম্বা বৃক্ষজাতীয়। এদের অনেকেই বনের তলদেশ খালি না রেখে সাধারণত দলবদ্ধভাবে জন্মায়।

সুন্দরবনের কিছু গাছের পরিচয় এখানে দেয়া হলোঃ (ছবি ক্রমানুসারে দেয়া হবে, যা নেট থেকে সংগৃহিত)

১) গেওয়া (Excoecaria agallocha): গেওয়া সোজা লম্ব হয়ে উঠে যায়। এর দেহ থেকে সাদা কষ বের হয়। এই কষ খুবই বিষাক্ত এবং আঠালো। এই গাছের কাঠ হালকা, তাই এই গাছের বড় বড় গুড়ি দিয়ে ঢোল এবং তবলা তৈরি হয়। সাধারণত এই গাছ জোয়ারে প্লাবিত ভূমিতেই বেশি দেখা যায়। এর পাতা ও ফল হরিণের প্রিয় খাবার।

২) গরান (Ceriops decandra): গরান গাছ প্রায় ৩-৪ মিটার উঁচু হয়। এই গাছগুলো ঝাড়বিশিষ্ট। এক ঝাড়ে অনেক কয়টি গাছ থাকে। কাঠ অতি শক্ত, গাছের ভেতরের রঙ লাল। গরানের বন বাঘের প্রিয় আবাসস্থল।কারণ ঝাড়ের ভেতর আত্মগোপনের সুবিধা। এটা সুন্দরবনের দক্ষিনাঞ্চলে জন্মে।

৩) কেওড়া (Sonneratia apetala) : সুন্দরবনের অন্যসব গাছের মতো কেওড়া গাছ মানুষের কাজে খুব একটা না লাগলেও সুন্দরবনের বানর এবং হরিণ অনেকাংশে এই গাছের ওপর নির্ভরশীল। নদী ও খালের কাছেই এই গাছ জন্মায়। এর ফলের স্বাদ টক। কেওড়া ফলের চাটনি বা টক মুখরোচক। কেওড়া বা ওড়া একই প্রজাতির গাছ।

Image may contain: plant, tree, sky, outdoor and nature

৪) ছইলা বা ওড়া (Sonneratia caseolaris) : এরও টক রান্না করে খায়। Image may contain: text that says '88% 7:05 AM Didarul Alam Babul Active 24 minutes ago Write a message... ම@ මම'

৫) পশুর (Xylocarpus mekongensis) :বাইনের মতো পশুর গাছও বড় গাছ। পশুরের পাতা অনেকটা কাঁঠাল পাতার মতো। এই গাছ নদীর ধার ঘেষে জন্মায়।Image may contain: fruit and food

৬) ধুন্দুল (Xylocarpus granatum) : পশুর বা ধুন্দুল একই প্রজাতির গাছ। তবে পশুর থেকে এর ফলের আঁকার বেশ বড় হয়। এই গাছ বনের ভেতরে শক্ত মাটিতে জন্মায়।

৭) ৩ ধরণের বাইন (Avicennia alba, A. marina, A officinales) : নতুন পলি জমে যে ভূখণ্ড জেগে ওঠে তাতে বাইনের বন বেশি গড়ে উঠতে দেখা যায়। বাইন বেশ বড় গাছ, এর আয়ুও বেশ দীর্ঘ। এই গাছে ভালো কাঠ হয়। ৩ প্রজাতির বাইন দেখা যায় সুন্দরবনে। ১টি দেখতে কেওড়ার মত, নদীর খানিকটা উঁচুতে এটা জন্মে।

৮) হেঁতাল বা হেন্দাল (Phoenix pelludosa): হেঁতাল গাছ লবণাক্ত জমিতে কম জন্মায়। এই গাছ জন্মায় উঁচু জমিতে, দেখতে অনেকটা খেজুর গাছের মতো। এক জায়গায় অনেক হেঁতাল ঝাড় দেখা যায়। হেঁতাল দৈর্ঘ্যে ৫-৬ মিটার পর্যন্ত লম্বা হয়। হেঁতালের গাছের আশে পাশে বাইন গাছও দেখা যায়। এই গাছ সুন্দরবনের সর্বত্রই দেখা যায়। এর ফুল থেকে মৌমাছিরা মধু সংগ্রহ করে।

৯) সুন্দরী ( Heritiera fomes): সুন্দরবনের গাছগুলোর মধ্যে সবথেকে আকর্ষণীয় হল সুন্দরী গাছ। সুন্দরীর পাতা ছোট, লবঙ্গের পাতার আকারবিশিষ্ট। এর পাতার পৃষ্ঠভাগ মসৃণ, এর নিচের অংশ ধূসর। সুন্দরীর ফুলও আকারে ছোট। বর্ণ হলুদ। সুন্দরী গাছ লম্বায় ১০-২৫ মিটার পর্যন্ত হতে পারে। সম্পূর্ণ বড় হয়ে গেলে কিছুটা বড়সড় জাম গাছের মতো দেখায়। সুন্দরীর গুড়ির বেড় ২০-২৫ সেন্টিমিটারের মতো হয়ে থাকে। কাঠ গাঢ় লাল এবং শক্ত। এর কাঠ খুবই মূল্যবান। বলেশ্বর ও শিবসা নদীর মধ্যবর্তী অঞ্চলে সুন্দরী গাছের সমারোহ।

১০) নিপা পাম বা গোলপাতা (Nipa fruticans): সুন্দরবনের অন্যতম খ্যাতিমান গাছ হল গোলপাতা। নারকেলজাতীয় এই গাছটি মাটির ওপরে মুলাকৃতির কাণ্ড থেকে নারিকেল বা তাল পাতার মতো সরাসরি বেরিয়ে আসে। শাখাহীন এই গাছের ফল আকারে প্রায় ফুটবলের মতো বড়, এই ফলের কারণেই এই গাছের নাম গোল হয়েছে। এর ফল খেতে বেশ সুস্বাদু, কিছুটা তালের শ্বাসের মতো। এই গাছের পাতা দিয়ে ঘর ছাওয়া যায়। সুন্দরবন থেকে প্রতিদিনই প্রচুর পরিমানে এই গাছ নিধন করা হয় যে কারণে এই গাছ হুমকির মুখে রয়েছে। এই গাছ জন্মে নদীর খাঁড়ি ও তীরভূমিতে।

১১) টাইগার ফার্ন (Acrosticum aureum): গা-ঢাকা দেওয়ার জন্য বাঘ এসব ঝোপ ব্যবহার করে।

১২) গর্জন বা ঝানা (Rhizophora mucronata) সুন্দরবনের প্রায়ই সবখানে গর্জন গাছের দেখা পাওয়া যায়। এই গাছের পাতা রবার গাছের পাতার মতো পুরু। ফুল ছোট, আর ফল হয় বকফুল কিংবা সজনের ফলের মতো লম্বাটে। কাঠ লালচে ধূসর বর্ণের। কাঠ খুব টেকসই নয়। এর ফল দেখতে ছাগলের শিং এর মত।

১৩) কাঁকড়াঃ(Bruguiera gymnorrhiza) কাঁকড়া গাছের পাতাও কিছুটা গর্জন পাতার মতো দেখতে হয়। তবে এ গাছের ফুলের বৃন্ত লাল কাঁকড়ার পায়ের মতো দেখায় বলে একে কাঁকড়া গাছ বলা হয়ে থাকে। এর কাঠ মজবুত এবং শক্তিশালী হওয়ার কারণে ঘরের ছাদের বীম হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এই গাছ অনেক উঁচু হয়।

১৪)পরশপিপুলঃ(Thespesia populnea Syn: Hibiscus populnea) কেওড়ার মতো নদীর ধারে পরশ গাছও জন্মায়। নদীর ধারে পরশ গাছের ঝাড় দেখা যায়।

১৬) হরগোজা (Acanthus ilicifolius) এই গাছে কাঁটা ভর্তি থাকে। ফুল বেগুনি রঙের।

১৭) কুম্ব (Barringtonia racemosa):

১৮) সুন্দরী লতা ( Brownlowia tersa):

১৯) ডাগর ( Cerbera manghas):

২০) গুরা বা গুরাল (Kandelia candel):

২১) নোনা ঝাউ (Tamarix indica):):

২২) নোনা ঝাউ (Tamarix indica):

২৩) পুইন্যাল ( Calophyllum inophyllum):

২৪) সিংড়া (Cynometra ramiflora):

২৫) কালি লতা (Derris trifoliata )

২৬) আরালি (Leersia hexandra) :

২৭) খুলশী (Aegiceras corniculatum):
২৮) তুনশা (Bruguiera cylindrica) :
২৯) করঞ্চা (Pongamia pinnata) :



মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

শুষনি শাক চেনেন কি?

শুষনি শাক (Marsilea minuta)  হাইপারটেনশন ও ঘুমজনিত সমস্যার মহৌষধ হিসেবে শুসনি শাক ব্যবহার করেন ময়মনসিংহের গারো ও কোচ উপজাতিরা। তারা এর রস ব্যবহার করেন কাশি ও শ্বাস-প্রশ্বাসজনিত রোগের ওষুধ হিসেবে। এটিকে শাক হিসেবেও রান্না করে খান তারা। ডঃ অসীমা চাটার্জী এই শাক থেকে এপিলেপ্সির ঔষধ আবিস্কারের পেপার বের করেছেন। বাংলাদেশের সর্বত্রই এ উদ্ভিদটি পাওয়া যায়। অনেকে শুষনী আর আমরুলি শাককে একই মনে করেন। আসলে শুষনি শাকে পাতা ৪ ভাজ, কিন্তু আমরুলি হলো ৩। আরেকটা পার্থক্য হলো শুষনী শাক টক স্বাদযুক্ত নয়, কিন্তু আমরুলি টক। এর বৈজ্ঞানিক নাম Marsilea minuta  আমরুল শাক থেকে শুষনি শাক পাতা আকারে বড়। তাছাড়া আমরুল লতানে ছোট গুল্ম উদ্ভিদ হলেও শুষনি সেরকমটি মোটেও নয়। শুষনি শাক

বৃক্ষকথা, Brikkho-Kotha: পাদাউকের প্রতি ভালবাসা

বৃক্ষকথা, Brikkho-Kotha: পাদাউকের প্রতি ভালবাসা : পাদাউক গাছ মুগ্ধ হতাম যার বিশালতা আর পাতার বিন্যাসে, কল্পনা ছিল তার ফুল না জানি কেমন হবে? ভর দুপুরে একরাশ রৌদ্র গায়ে মেখে ছুটে গেলাম সেই...

আমার কানাইবাঁশি

বেণুবর্ণা অধিকারী যে রঙ ঈর্ষনীয় অনেক ফুলের কাছে। অথচ সে খুবই ক্ষুদ্র, অবহেলিত। " ফুল বলে ধন্য আমি, ধন্য আমি মাটির 'পরে" এটা কানছিঁড়া/ কানাইবাঁশি/ঘাসফুল/কানশিরা/ কানদুলি/ কানাইলতা। এর বৈজ্ঞানিক নাম Commelina benghalensis. নানাবিধ ঔষধি গুণসম্পন্ন এই ক্ষুদে গাছ। মূলতঃ জীবানু নাশক গুল্ম। কানের ইনফেকশনে বা চোখের অঞ্জলি হলে এর রস করে দিলে উপশম হয়, গাছকে একটু গরম করে তারপর রস বের করে দিতে হয়। এছাড়া কুষ্ঠ, একজিমা, দাদ রোগেও এর প্রচলন আছে। পোকার আক্রমনের প্রদাহে এর রস লাগালে দ্রুত আরোগ্য হয়। Commelinaceae পরিবারের গাছ। অনেকে একে জোনাকি শাক বা পাতা বলে থাকে। নরম কাণ্ড বিশিষ্ট এই গাছ ছায়ায় নিজেদের কলোনী করে বাস করে। পাতার গোড়ায় ছোট্ট নীল ফুল আর এর পাতার সবুজতা মনকে সজীব করে। অনেকেই একে শাক হিসেবে খেয়ে থাকেন। তবে কি কারণে খান এবং খেতে কেমন জানিনা। এর আরো কোন ব্যবহার কি আছে?